কলকাতায় বইমেলা চলাকালীন মিশরের রাজধানী কায়রো বইমেলায় যাবার আমন্ত্রণ এসেছিল৷ পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এই বইমেলা, যাকে বৃহত্তম বইমেলা করতে আরবদুনিয়া বদ্ধপরিকর, এবার ছাপ্পান্ন বছরে পড়ল৷ আরবি দুনিয়ায় বইয়ের চাহিদা, পাঠকের আগ্রহ, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কবি লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ উপেক্ষা করতে পারিনি৷ মেলা হচ্ছে ‘ইজিপ্ট আন্তর্জাতিক এগজিবিশন সেন্টার’-এ যার সঙ্গে অনেকটা মিল পাওয়া যাবে দিল্লির প্রগতি ময়দানের৷ বিশাল পরিসর, সেখানে পরপর অনেকগুলো খুব বড় আকারের হল৷ বিভিন্ন আয়তনের ছয় হাজারের কিছু বেশী স্টল নিয়ে এই মেলায় অংশগ্রহণ করেছে ৮০টি দেশের ১৩৪৫ জন প্রকাশক৷ এছাড়া রয়েছে ইজিপ্ট-এর প্রকাশক, বই বিক্রেতা, সরকারি স্টল যেমন ওদের ন্যাশনাল লাইব্রেরি, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ বা ব্যাগ, খাতা কলমের স্টল ইত্যাদি৷ খাবারের দোকান স্টল হলের বাইরে রাস্তা পার হয়ে অন্যদিকে যেখানে গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা রয়েছে তার পাশে৷ মেলা চলবে ২৩ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি অবধি সকাল দশটা থেকে সন্ধে আটটা৷ মেলার আয়োজক ‘ইজিপসিয়ান জেনারেল বুক অরগানাইজেশন’ আর প্রধান পৃষ্ঠপোষক মিশরের রাষ্ট্রপতি৷
আরবদুনিয়া মানেই যে শুধু তেল, খনিজপদার্থ, যুদ্ধ, মরুভূমি, তা নয়, বইয়ের একটা বাজার যে এখানে রয়েছে, এখানেও লোকে বই পড়ে, বই কেনে অথবা মিশর মানেই যে শুধু পিরামিড, মমি তা নয়, এই সংস্কৃতি বা বই চর্চার আবহ সারা বিশ্বের কাছে মেলে ধরতে এখানকার সরকার বদ্ধ পরিকর৷ এই জন্যই অন্যান্য দেশের কুড়ি পঁচিশজন কবি লেখককে চার দিনের জন্য আমন্ত্রণ করে এনেছেন এঁদের বইমেলা দেখার জন্য, নানান আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য৷ উদ্দেশ্য নিজেদের সারস্বত চর্চা বাইরের কাছে পৌঁছে দেওয়া, আবার বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতিচর্চা সম্পর্কে আগ্রহী মিশরবাসীকে অবহিত করা।
যে হলগুলোতে মেলা হচ্ছে তার বাইরে প্রতিটা হলের সামনে ছোটো করে মঞ্চ বাঁধা৷ সেখানে মিশরীয় বিভিন্ন লোকশিল্প, নৃত্য, সঙ্গীতের প্রদর্শনী৷ বিভিন্ন দল এক একটা মঞ্চে তাদের নির্দিষ্ট সময়ে দলগত পার্ফর্মেন্স করছে৷ বই-প্রদর্শনী হলগুলো দ্বিতল৷ ওপরের তলে যাবার জন্য এসকালেটর রয়েছে, কিন্তু সেখানে প্রবেশ অবারিত নয়৷ শুধু আমন্ত্রিতরাই যেতে পারবে৷ ওপরের তলে রয়েছে তিনটে করে আলোচনা কক্ষ৷ প্রকাশকরা লেখকরা এখানে অন্যান্য দেশের প্রকাশকদের সঙ্গে কপিরাইট কেনা বেচা নিয়ে আলোচনা করেন৷ অনেকসময় লেখকদের সঙ্গেও আলোচনা হয়৷ এছাড়া রয়েছে একশো জন মত বসার দুটো সভাকক্ষ৷ এখানেই কবিতা পাঠ, আলোচনা ইত্যাদি হয়৷ আমন্ত্রিত অতিথিদের সব অনুষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে, হলগুলোর ওপরে এখানেই ব্যবস্থা৷ এগজিবিশন হলগুলোর নামও বেশ কৌতুহলোদ্দীপক৷ কোনোটার নাম আন্তর্জাতিক হল, কোনোটা সাংস্কৃতিক হল, কোনোটা সৃজন হল বা কবিতা হল৷
কয়েকটা হল সাজানো হয়েছে অনেকটা ইন্ডাষ্ট্রি বা ট্রেড ফেয়ারের মতন৷ অর্থাৎ স্টলের মধ্যেই নানান মিটিং, প্রদর্শনী, আলোচনার জায়গা৷ এই স্টলগুলো বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানের। কোনো কোনো স্টলে সেই দেশের সঙ্গীত পরিবেশনের ব্যবস্থাও রয়েছে। আরবিক দুনিয়ার সব দেশই অংশগ্রহণ করেছে এই মেলায়৷ ইউনাইটেড আরব এমিরিটাস, সৌদি আরব, জর্ডন, মরক্কো ইত্যাদি মধ্যপ্রাচ্য ও আরবি বলা আফ্রিকান দেশতো আছেই তার পাশাপাশি পশ্চিমের দেশগুলো যেমন গ্রীস, বেলজিয়াম, অস্ট্রিয়া, আমেরিকা, রোমানিয়া প্রভৃতি দেশগুলোও রয়েছে৷ আরব সাম্রাজ্যের বিপুল বইয়ের বাজারকে ঈষৎ নাক উঁচু পশ্চিমীরা আর উপেক্ষা করতে পারছে না৷ নিজেদের বই আরবি ভাষায় অনুবাদে এঁরা হাজির করেছেন৷ সঙ্গে দু-এক কপি করে মূল ভাষার বইও রয়েছে, কিন্তু তা বিক্রির জন্য নয়৷ শুধু দেখার জন্য৷ হলগুলোর বাইরে বিশাল তাঁবু খাটিয়ে একপাশে বিক্রি হচ্ছে ইংরেজি বই। আন্তর্জাতিক যে সব প্রকাশনার নাম আমরা জানি তারা প্রায় সকলেই রয়েছে, যদিও সেখানে ভিড় খুব একটা নেই৷ শুধু একপাশে শিশু কিশোর সাহিত্যের বই যেখানে, সেখানে কিছু আগ্রহী ক্রেতার ভিড় দেখলাম, যা বোঝায় মিশরের বর্তমান প্রজন্ম ক্রমশ ইংরেজিতে আগ্রহী হচ্ছে৷
বইমেলায় ঢুকতে একটা প্রবেশমূল্য আছে, যা হল আমাদের অর্থমূল্যে ন’ টাকার মতন৷ কয়েকটা টিকিট কাউন্টার রয়েছে, কিন্তু ফাঁকা৷ অর্থাৎ সকলেই অন-লাইনে টিকিট কেটেছেন৷ জানা গেল মেলা কর্তৃপক্ষের আশা দু-সপ্তাহের মেলায় প্রায় পঞ্চাশ লক্ষের কাছাকাছি মানুষ এখানে আসবে৷ উদ্বোধনের দিনই দর্শক হয়েছিল চারলক্ষ৷ কিছুটা বিস্ময় সৃষ্টি করে যে এই ফেসবুক, রিল-এর যুগে বই পড়ার চর্চা এখানে বেড়েই চলেছে।
মিশরবাসীর বেশীরভাগই ইংরেজি জানেনা বা বলতে পারেন না৷ যদিও কিছু কিছু কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি আর স্প্যানিশ পড়ানো শুরু হয়েছে৷ এঁদের কেউ কেউ আমন্ত্রিতদের কবিতা ইংরেজি অনুবাদে আনিয়ে আরবি ভাষায় অনুবাদ করিয়ে রেখেছিলেন৷ কবিদের নিজস্ব কবিতা পাঠের পর তাঁরা অনুবাদ পড়ে দিচ্ছিলেন আরবি ভাষায়৷ প্যানেল আলোচনায়ও একই ব্যাপার৷ আমরা যা বলছি সঙ্গে সঙ্গে অনুবাদক আরবি ভাষায় তা বলে দিচ্ছেন৷ প্রশ্নোত্তর পর্বে দেখা গেল বাংলা কবিতা বা ভারতীয় কবিতা সম্পর্কে শ্রোতাদের আগ্রহ প্রবল, যদিও নোবেল প্রাপক বলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Tagore) এর নাম ছাড়া তাদের বিশেষ কিছুই জানা নেই। তিনিও বাংলা ভাষাতে লিখতেন জেনে স্বাভাবিক ভাবেই নানাবিধ প্ৰশ্ন বাংলা কবিতা ও সাহিত্য নিয়ে শ্রোতাদের থেকে আসতে থাকল৷ বাংলা ভারতীয় সাহিত্য সম্পর্কে তাদের কৌতূহল যথেষ্ট।
মিশর যাবার কোনো সরাসরি উড়ান কলকাতা থেকে নেই। কাতারের দোহা অথবা দুবাই হয়ে যেতে হয় ৷ দুটো উড়ান মেলালে সাড়ে ন’ ঘন্টা৷ এই দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম আরবদুনিয়ায় অন্তত ভারতীয় আর বাংলা কবিতার এক চিলতে ধারণা রেখে আসা গেলাবইয়ের বাজার ধরতে প্রকাশকদের এবার আরব দুনিয়াতেও নজর দেওয়া জরুরি।
প্রবালকুমার বসু
পণ্ডিতিয়া টেরেস
কলকাতা-২৯
মো-৯৮৩০০২৫৭৪৭৮
