বাঙালি জাতি হিসেবে স্বপ্ন দেখা ভুলেই গিয়েছিল৷ সেই কবে, গত শতকের ছয়-এর দশকে কিছু মধ্যবিত্ত বাঙালি যুবক সমাজকে পাল্টে দেবার স্বপ্নে একটা আন্দোলন শুরু করতে চেয়ে নৈরাজ্যের পথে চলে গিয়েছিল, তারপর থেকেই বাঙালির জাতি হিসেবে কেবলই আত্মক্ষয়ের বিবর্তন৷ সকলে নিজ নিজ প্রকোষ্ঠে আবদ্ধ থেকে যাপন করছিল জীবন যেখানে কোনো বৃহত্তর স্বপ্ন নেই৷ বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটাতে যে সুশীল সমাজ এগিয়ে এসেছিল তা কখনো সার্বিক হয়নি কেননা সেই আন্দোলনের উৎসে ছিল রাজনৈতিক চিত্রপট৷ আর. জি. করের দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাঙালি যেন আবার জেগে উঠল, স্বপ্ন দেখল, আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল বিশেষত মহিলারাও বিশ্বাস করতে শুরু করলেন যে তাঁরাও পারেন, পিছনে থেকে নয়, সামনে থেকে৷
নানাবিধ কারণে আমাকে নানান দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়৷ এইবারের আন্দোলন যখন মাঝপথে, সেইসময় ব্যক্তিগত কারণে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল ইউরোপের কয়েকটি দেশের উদ্দেশে৷ ইউরোপের নানান দেশের বিষয় ভিত্তিক প্রতিবাদ দেখেছি যেমন রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ বা ইজরায়েলের গাজা আক্রমণের প্রতিবাদ৷ ইউরোপের এই আন্দোলন আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না৷ জার্মানির কোলোন শহরে গত বছরে দেখেছি এক বিশাল জনসংখ্যার মানুষ ইউক্রেন আক্রমণের প্রতিবাদের ফেস্টুন নিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র রেল স্টেশনের পাশে গীর্জা চত্বর থেকে কিছু দূরে অবস্থান করেছে৷ কারো কারো হাতেও প্রতিবাদের ছোটো ফেস্টুন৷ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, কোনো চিৎকার করে স্লোগান নেই৷ কারো কারো হাতে গীটার, তারা গীটার বাজিয়ে গান গাইছে৷ আমি জার্মান ভাষা বুঝি না৷ সুর শুনে মনে হচ্ছিল গানগুলো প্রতিবাদের৷ আমার সফর সঙ্গী গানের মানে বুঝিয়ে দিলেন৷ মানে শুনে মনে হল, আরে এ-তো আমাদের প্রতিবাদের গানগুলোর মতন, যার সুরের সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে সলিল চোধুরীর কিছু সুরের৷ এই প্রতিবাদী মানুষদের রাজনৈতিক বিশ্বাস যাই থাক, সেই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হয়ে কেউ ছিল না৷ ছিল আপন বিশ্বাসের তাগিদে৷ রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে বা ইজরায়েল গাজায় সাধারণ মানুষদের মেরে ফেলছে এতে জার্মানির এই লোকগুলোর কি কিছু আসা যাচ্ছিল? বৃহত্তর মানবিক স্বার্থই তাদের কাছে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছিল৷ এই বৃহত্তর মানবিকতার জায়গা থেকেই আজকের জার্মানি দরোজা খুলে দিয়েছে রাশিয়ান আক্রমণে বিধবস্ত ইউক্রেনের রিফিউজিদের জন্য৷ শুধু জার্মান দেশে থাকার অনুমতি দেওয়া নয়, প্রত্যেক পরিবারকে তাদের পরিবারের আয়তন অনুযায়ী ভাতাও দিচ্ছেন সরকার৷ এই ভাতার পরিমাণ নেহাত কম নয়৷ মাসে দুইহাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার ইউরো পর্যন্ত৷ এতে কিছু ক্ষোভ জার্মান নাগরিকদের মধ্যে যে জড় হচ্ছে না তা নয়, চরম দক্ষিণপন্থীরা এর থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতেও সচেষ্ট, তবু পীড়িতের পাশে তারা আপন বিশ্বাসে স্বেচ্ছাতেই দাঁড়িয়েছে৷
স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাতিস্লাভায় যে তরুণের সঙ্গে আলাপ হল তার কাজ পায়ে হেঁটে ইচ্ছুক ট্যুরিস্টদের ব্রাতিস্লাভা দেখানো তার ইতিহাস সম্পর্কে বাইরে থেকে আসা মানুষদের অবহিত করা৷ ছেলেটি অন্যান্য দেশ সম্পর্কে বেশ ওয়াকিবহাল৷ এই মুহূর্তে কলকাতায় কী হচ্ছে ও জানে৷ বলল তোমাদের এই আন্দোলনের ধরণটা অনেকটাই ইউরোপিয়ানদের মতন গান গেয়ে নীরব মিছিল করে৷ ১৯৮৯ সালে স্লোভাকরা রাশিয়ান কমিউনিস্ট শাসন থেকে বেরিয়ে আসতে ওদের টাউন স্কোয়ারে সবাই জমায়েত হয়ে ঘণ্টা বাজাত৷ এবং এটা প্রতিদিনই করত৷ ওর বা ওদের মত তরুণেরা বিশ্বাস করে আজকে বদল আনার জন্য রক্তপাত অপরিহার্য নয়৷
কিন্তু যুবকটি এই কথা জানাতে ভোলে না যে তোমরা যে কারণ নিয়ে আন্দোলন করছ, আমরা কিন্তু এই কারণগুলো স্বপ্নেও ভাবতে পারি না৷ আমাদের এখানেও দুর্নীতি আছে কিন্তু তা খাদ্য, শিক্ষা বা স্বাস্থ্যকে স্পর্শ করে না৷ আমি আর কথা বাড়ালাম না, কী জানি আরো কী কী বলবে!
সত্যিই তো, আমাদের আন্দোলনের ধরণটাই পাল্টে গিয়েছে৷ প্রতিবাদের ধরণটাই৷ তরুণরা আবার চোখে চোখ রেখে সংযমের সীমারেখা অতিক্রম না করে, বিনীতভবাবে প্রতিবাদ করতে শিখে গেছে৷ আর সেটাই জোগান দিয়েছে নিজ নিজ আত্মবিশ্বাসের৷
এই প্রসঙ্গে একটা পুরনো ঘটনা মনে পড়ল৷ ২০০৩-এ ইরাক আক্রমণের আগে আগে আমেরিকার সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশ (জুনিয়র)-এর মনে হয়েছিল এরকম একটা সিদ্ধান্তের জন্য চিন্তাশীল সমাজের সমর্থন প্রয়োজন৷ তাই একশজন কবি, লেখক বুদ্ধিজীবীদের হোয়াইট হাউসে এক চা চক্রে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন তিনি৷ আমন্ত্রিতদের মধ্যে একজন কবির মনে হয়েছিল এই আমন্ত্রণ সভাই প্রতিবাদে পাল্টে দিলে কেমন হয়? সেই একজন কবি স্যাম হ্যামিল৷ তিনি নিমন্ত্রিত বাকিদের মেইল-এ জানালেন তাঁর ভাবনা৷ সকলেই সম্মত, ঠিক হল সবাই একটা করে কবিতা পড়ে জানাবে প্রতিবাদ৷ হোয়াইট হাউস গোয়েন্দা বিভাগ এই মেইল চালাচালি কান্ড জানতে পেরে যায়৷ নির্ধারিত দিনের আগের দিন আবার সবার কাছে একটা মেইল আসে আমন্ত্রণ বাতিলের সংবাদ নিয়ে৷ আমন্ত্রিতরা দ্রুত সিদ্ধান্ত বদলালেন, তাঁরা নির্ধারিত দিনেই সম্মিলিত হলেন হোয়াইট হাউসের সামনে, পাঠ করলেন কবিতা, যেখান থেকে ‘পোয়েটস্ এগেনস্ট ওয়ার’ এক বৃহৎ আন্দোলনের সূত্রপাত৷ স্যামের সঙ্গে পরিচয় আর বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম— এই যে কবিদের আন্দোলন বা সক্রিয়তা তা কি ইরাক আক্রমণ আটকাতে পারল?
স্যাম উত্তর দিয়েছিল রাষ্ট্রকে আটকানো কবিতার কাজ না৷ কিন্তু কবিতা বা শিল্প যেটা পারে সেটা হচ্ছে সচেতনতা তৈরি করতে, যাতে ভবিষ্যতে আগ্রাসনের আগে রাষ্ট্র আরো একবার ভাবে, যা করছে তা ঠিক করছে কি না৷ আমরা সবই দেখছি, সবই শুনছি, তবু মুখ ফিরিয়ে থাকছিলাম আর জমা করছিলাম ভিতরে ক্ষোভ, কিছু না করে উঠতে পারার ক্ষোভ, হতাশা৷ সেই ক্ষোভের স্তূপে অগ্নি সংযোগ করলেন তরুণ প্রজন্মের জুনিয়ার ডাক্তাররা যাদের চোখে এক রাশ স্বপ্ন সেই স্বপ্ন সঞ্চারিত হল সাধারণ মানুষের মধ্যেও৷ আমাদের তরুণ প্রজন্মতো সেটাই করে দেখাল৷ কোথায় যেন বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের সুরে এসে মিলল আমাদের প্রতিবাদের সুর৷
