বাঙালির পার্বণ বারো মাসে আর তেরোতে শুধু আটকে নেই। অনেক কিছুর সঙ্গে বইমেলাও একটা পার্বণ। প্রকাশক অপেক্ষা করে থাকেন, পাঠক অপেক্ষা করে থাকেন, লেখক সম্পাদকও অপেক্ষা করে থাকেন বাৎসরিক এই পার্বণের জন্য। সেই ১৯৭৬ সাল থেকে কোনো বইমেলাই এখনো আমার বাদ পড়েনি। দেখেছি মেলার চরিত্র কীভাবে পাল্টেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বদল স্বাভাবিক কিন্তু এর সঙ্গে পাল্টে গেছে প্রকাশনার চরিত্রও। অনেক নতুন ছেলেমেয়েরা সামান্য পুঁজি সঞ্চয় করে এসেছেন প্রকাশনায়। এঁরা নিজেদের সাধ্য ও পছন্দমতো বই প্রকাশ করছেন। এক সময় নতুন লেখকেরা বই প্রকাশের ক্ষেত্রে ছিলেন অসহায়। কয়েক দশক আগে অবধি এত প্রকাশনা ছিল না, যাঁরা ছিলেন তাঁরা অনেকেই নতুন লেখকদের কাছ থেকে কত মুনাফা আদায় করা যায় তাতেই ছিলেন বেশী মনোযোগী। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে এই শতকের প্রথম দশক পার করে। বিশেষত প্রিন্ট অন ডিমান্ড (পি ও ডি) বাজারে আসার পর থেকে। গত শতকের শেষাশেষি কম্পিউটার এসে যাবার পর থেকে লেখা কম্পোজ করা সহজ হয়ে যায়। আগে অনেকটা জায়গা লাগত, লেটার প্রেসের সময় টাইপ-সেটিং করে রাখতে হতো। তারপর প্রুফ কারেকশন হয়ে এলে আবার সেই টাইপ-সেটিং-এ গিয়ে ঠিক করা হতো। এই কম্পোজ যেখানে হতো, মোটামুটি কোনো বাড়ির একতলার ঘর, এমনকি উঠোনের ওপর দিক কাপড় দিয়ে ঢেকে যাতে জল না পড়ে। এর ওপর ছাপাখানার ভুল তো ছিলই। কম্পোজারের টাইপ-সেটিং কম পড়লে বা হারিয়ে গেলে অনেক সময় সংশোধন ছাড়াই চলে যেত বই। কম্পিউটার হওয়াতে আয়াসহীনভাবে সংশোধন বার বার করা যায়, বিষয়টা সহজ হয়ে আসে। ছোটো ঘরে বেশ কয়েকটা যন্ত্র বসিয়ে চলত কম্পোজ। লেটার প্রেসে টাইপ-সেটিং-এর যুগে প্রায় সব বই-ই অন্তত এগারোশো কপি ছাপা হতো। এই এগারোশো কপিকে ধরা হতো একটি সংস্করণ। তবে কবিতার বই সেই অবস্থাতেও সাড়ে তিনশো কপির বেশি ছাপা হতো না। বাংলা কবিতার জগতে দুটি প্রখ্যাত বই ‘হে প্রেম, হে নৈঃশব্দ্য’ আর ‘ফিরে এসো চাকা’-র প্রকাশকের কাছে শুনেছি প্রথম সংস্করণ সাড়ে তিনশো কপি করে ছাপা হয়েছিল। প্রায় সব কপিই বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য পরবর্তী সময়ে খুব প্রতিষ্ঠিত কোনো কবির এগারোশো কপিও একটি সংস্করণে ছাপা হয়েছে জানি। সেটা ব্যতিক্রমই। এখনো কোনো কবির বই বিক্রি একবছরে দু’শো কপি পার হলেই খুব ভালো বিক্রি হিসেবে ধরা হয়। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া বেশিরভাগ কবিতার বই-ই একশো কপি বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাও কয়েক বছর লেগে যায় এই বিক্রি হতে। এমন সময় সদ্য লিখতে আসা কবি বা লেখকেরা যখন বিভ্রান্ত, বাংলা প্রকাশনাও ক্রমশ ঝিমিয়ে পড়ছে, নতুন কেউ প্রকাশনায় সেইভাবে আগ্রহীও হচ্ছে না, এই অবস্থায় প্রিন্ট অন ডিমান্ড যেন প্রকাশনার জগতে এক সুরাহা এনে দিল। এক বদ্ধজলাশয় খুঁজে পেল নিষ্ক্রমণের পথ। এই পদ্ধতিতে চল্লিশ পঞ্চাশ কপি বা তারও কম বই ছাপানো যায়। অর্থাৎ লগ্নি কম, অল্প ঝুঁকি। অনেক তরুণ আগ্রহী হলেন প্রকাশনায় লগ্নি করতে। তাঁদের বিচার বিবেচনা মত কোনো নতুন বইয়ে টাকা লাগালেন। হয়তো পঞ্চাশ একশো কপির জন্যই। তারপর বইয়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রিন্ট করাতে লাগলেন। এতে প্রকাশক, প্রিন্টার বা বাঁধাই দপ্তর কাউকেই স্টক বহন করার দায় নিতে হল না। বিশেষত যাঁরা নতুন লেখকদের অথবা ব্যতিক্রমী বই যা ততটা বাজার চলতি নয় অথচ গুরুত্বপূর্ণ লেখা, তা প্রকাশ করেন।
এটা প্রকাশনার জগতে এক দিকবদল। যাঁদের ক্ষুদ্র পত্রিকা আছে, যাঁদের অনেকেই কিছু বাছাই প্রকাশনা করেন, কলকাতা বইমেলায় লিটল ম্যাগ প্যাভিলিয়নে বসতেন তাঁদের সম্ভার নিয়ে, পি ও ডি ব্যবস্থার ফলে তাঁদের অনেকেই দেখা গেল বই প্রকাশের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। টেবিলে তাঁদের বইয়ের সঙ্কুলান হচ্ছে না। আগে মেলায় একশত স্কোয়ার ফুট স্টলই ছিল সবচেয়ে ছোটো, গতবছর থেকে দেখা গেল মেলা আয়োজকরা লিটল ম্যাগ টেবিল আর একশত স্কোয়ার ফুটের ছিল সবচেয়ে ছোটো, গতবছর থেকে দেখা গেল মেলা আয়োজকরা লিটল ম্যাগ টেবিল আর একশত স্কোয়ার ফুটের মাঝামাঝি পঞ্চাশ স্কোয়ার ফুটের স্টল করেছেন আর তারও চাহিদা কিছু কম নয়। হয়ত কোনো কোনো বড় প্রকাশকও কিছু কিছু বই এইভাবেই প্রকাশ করা শুরু করেছেন। বদলটা জরুরি ছিল, এই ধর্মন্ধতার যুগে প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধি মানে বইচর্চা বৃদ্ধি কিছুটা অন্তত সুস্থতার পরিবেশ বজায় রাখে। এছাড়া বিপণন পরিষেবাও নানান ভাবে বেড়েছে। আগে কলেজস্ট্রিট বা মেলা ছাড়া বই পাওয়া যেত না। এখন ইন্টারনেটের যুগে ঘরে বসে অনলাইনেই বই পাওয়া যায়। কলেজ স্ট্রিটেও তৈরি হয়েছে অনেক ছোটো ছোটো বই বিপণি।
যে কোনো পদ্ধতিই (সিস্টেম) স্থিতাবস্থায় অনন্তকাল থাকতে পারে না। পরিবর্তন বা বিবর্তন এক অতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেই অর্থে প্রকাশনা জগতের এই পরিবর্তন বাঞ্ছনীয়ও। এর একটা অর্থনৈতিক দিকও আছে। অন্যান্য কর্মসংস্থানের অভাবে অন্তত প্রকাশনা তাদের অস্তিত্বকে সম্মানজনকভাবে বজায় রাখার সুযোগ পেয়েছে, তা সেই বই প্রকাশের খরচ প্রকাশক বহন করুক অথবা লেখক নিজেই দিক। অধিক বই ছাপাই প্রকাশনার অর্থনীতিকে আরো সচল করেছে।
কিন্তু এর একটা অন্যদিকও হয়েছে। এই যে এত বই বেরোচ্ছে, তার মধ্যে যেগুলো মাত্র চল্লিশ পঞ্চাশ কপি ছাপা হচ্ছে, এই বইয়ের ভবিষ্যৎ কী? প্রকাশনার বইয়ের পরিসংখ্যান বাড়ছে, লেখকের বইয়ের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু তার প্রচার থাকছে কয়েকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাংলা বই প্রকাশনায় সম্পাদনার চল নেই, যা বহু ইংরেজি প্রকাশনায় রয়েছে। হয়ত বাণিজ্যের পরিসর বাংলা বইয়ে সেই সুযোগ দেয় না। কিন্তু লেখকের খরচে বই ছাপানোয় কতটা লেখার মান বিচার্য হয় সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়। ফলে অনেক বইয়ের ভিড়ে প্রকৃত ভালো সাহিত্য হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। প্রকাশকদের এ বিষয়টা ভাবা বাঞ্ছনীয়।
দিল্লিতে এক সর্বভারতীয় প্রকাশনার কর্ণধার যাঁকে তাঁর প্রকাশনা শুরুর সময় থেকে দেখেছি, জানিয়েছিলেন প্রায় চোদ্দো পনেরো বছর লেগেছিল ব্রেক ইভেনে পৌঁছতে। তাঁর অন্য ব্যবসাও ছিল যা তাঁকে এতগুলো বছর সহায়তা দিয়েছে। কিন্তু প্রকাশনায় আসা বাঙালি যুবকদের কি সেই পরিমাণ ধৈর্য্য রয়েছে?
১৯ পণ্ডিতিয়া টেরেস,
কলকাতা-২৯
যোগাযোগ-৯৮৩০০২৫৪৭৮
